৮০। সূরা আবাসা (তিনি ভ্রুকুঞ্চিত করলেন)

শুরুতেই ১ম আয়াতে নবী মুহাম্মাদ (স) এর অবস্থা বর্ননা করা হয়েছে। বলা হচ্ছেঃ তিনি ভ্রু কুচকালেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন।      

তখন মুহাম্মাদ (স) মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছিলেন, যে সুযোগ সব সময় পাওয়া যেত না। তারা মাঝে মাঝে মন বলতো যে, মুহাম্মাদ, তুমি সাধারন, নিচু, দূর্বল, গরীব শ্রেনীর মানুষদের আশেপাশে রাখো তাই আমরা তোমার সাথে ঠিকভাবে বসতে পারি না, কথা বলতে পারি না। এজন্য তুমি আমাদের কাছে আসো। এমন এক পরিস্থিতিতে অন্ধ সাহাবী রাসুলুল্লাহ (স) এর কাছে আসেন এবং তার মনোযোগ আকর্ষনের চেষ্টা করে কিছু হেদায়াতের বানী শোনার জন্য আগ্রহী হন।      

মুহাম্মাদ (স) হয়তো ভেবেছিলেন (আল্লাহ ভালো জানেন) মক্কার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সময় দেবার পর তিনি উক্ত সাহাবীকে সময় দিবেন। এই সাহাবী তার পরিচিত, আত্মীয়ও হন। এরপরও উক্ত সাহাবীর আগ্রহ ও দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টায় রাসূলুল্লাহ ভ্রু কুচকে ফেলেন। এখানে ‘আবাসা’ শব্দটি দ্বারা বিরক্তির সর্বনিম্ন পর্যায়কে বোঝায় যার কারনে এর ভাব শুধু চোখেই সীমাবদ্ধ থাকে, পুরা মুখ, দাত ইত্যাদিতে প্রকাশ পায় না। অর্থাৎ তিনি খুবই নগন্য মাত্রায় এটি প্রকাশ করে ফেলেন। এর সাথে মুখ ফিরিয়ে নেন, মুখে কিছু বলেননি। যেহেতু উক্ত সাহাবী অন্ধ ছিলেন তাই তিনি সেটি দেখেননি এবং কিছু বুঝতেও পারেননি এবং অবশ্যই এর দ্বারা অপমানিতও হননি। 

কিন্তু যার দেখার তিনি দেখেছেন। তিনি হলেন আল্লাহ। তিনি তার নবীকে এমন উচ্চতায় নিতে চান যা সব যুগের সব মানুষের জন্য আদর্শ। এটা সাধারন মানুষের নিকট কোন ব্যাপারই না মনে হলেও এমন একজন আগ্রহী সাহাবীর রেসপন্সে মুহাম্মাদ (স) এর ভ্রু কুচকানোকে আল্লাহ তার স্ট্যান্ডার্ডে মানতে রাজি হননি। সাধারন মানুষের কাছে যেটা কোন ব্যাপার, অপরাধ নয় মুহাম্মাদ (স) এর এমন আচরনেও আল্লাহ তার দৃষ্টি আকর্ষন করে তাকে শিখিয়েছেন যে, মানুষকে যথাযথ উচ্চ মর্যাদা দিতে হবে, যদিও সে তা বুঝতে পারুক বা না পারুক।      

এজন্য এ বিষয়টি তিনি আল কুরআনে লিপিবদ্ধ করে দিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত মানুষদের জন্য এটা শিক্ষনীয় করে তুললেন। এটা মুহাম্মাদ (স) কে ছোট করা বা সেই সাহাবীকে ছোট করা নয় বরং মুহাম্মাদ (স) এর নৈতিকতা, আদর্শের উচ্চতম মান এর দিকেই দিক নির্দেশ করছে যে আল্লাহ তাকে কোন পর্যায়ের নৈতিকতায় তুলে নিয়েছেন! এজন্য আল্লাহ এ বিষয়ে খুবই সেনসিটিভ আচরন করে নবীর জীবনের আচরনের সূক্ষ্মতম স্লিপ ও শুধরে দিয়েছেন। সাহাবীদের মর্যাদাকে তিনি এত বাড়িয়েছেন যেন কোন সাহাবী নিজেকে অগুরুত্বপূর্ন মনে না করেন তিনি অন্ধই হোন আর যা হোন।    

এছাড়া মানুষ যে শুধু কাজের দ্বারা বা শারিরীক আঘাতের কারনে  এবং কথার কারনে কষ্ট পায় তা নয়, ইসলাম আমাদের শেখাচ্ছে মানুষ অন্যের চাহনী, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, আবেগের প্রকাশের কারনেও কষ্ট পায়। এই সূক্ষ অথচ হৃদয় বিদারক কষ্টও যেন কেউ কাউকে না দেয়। সুবহানাল্লহ!  

এর দ্বারা আরো প্রমানিত হয়েছে যে, আমাদের প্রিয় নবী যে নিজে আল কুরআন লিখেননি। কারন নিজের লেখা বইতে কেউ নিজের সমালোচনা এভাবে করে না। আবার তিনি যে আল কুরআন পরিবর্তন বা কিছু বাদ দিয়েছেন (নাউযুবিল্লাহ) এমনও নয় তাহলে তিনি এই জায়গা পরিবর্তন বা বাদ দিতেন।

২য় আয়াতে সাহাবী অন্ধ হলেও তিনি নিজ উদ্যোগে মুহাম্মাদ (স) এর কাছে এসেছিলেন শিক্ষা নিতে তা বর্ননা করা হয়েছে। এই আয়াত দ্বারা উক্ত সাহাবীর ঐকান্তিকতা, দ্বীনের প্রতি তার দরদ ও জ্ঞান ও হেদায়াত পাবার প্রচেষ্টার দিকটি ভালভাবে ফুটে ওঠে।

সূরা আবাসা এর ৩৬ নং আয়াতে জীবনসঙ্গীকে 'সহিবাহ' বলা হয়েছে। কুরআনের অন্য জায়গায় জীবনসঙ্গী এর আরো দুটি শব্দ 'ইমরআ' ও 'ঝাওজ' বলা হয়েছে। এগুলোর ব্যাখ্যা ও সৌন্দর্য্য একটু আলোচনার দাবী রাখে।  

সূরা লাহাবের ৩য় আয়াতে আবু লাহাবের স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ হিসাবে অবিহিত করা হয়েছে। ‘ঝাওজ’ শব্দটি দিয়েও স্ত্রী বুঝায়। ‘ইমরআ’ ও ‘ঝাওজ’ দুটি শব্দের অর্থ স্ত্রী কিন্তু সূক্ষ পার্থক্য আছে। স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান হলে কেবলমাত্র ‘ঝাওজ’ ব্যবহার করা যায়। অন্যথায় ইমরআ হিসাবে গণ্য হয়। 

নবী নূহ (আঃ), লুত (আ) ও ফেরাউন এর স্ত্রীকে আল কুরআনে ‘ইমরআ’ বলা হয়েছে। যেহেতু আবু লাহাব ও তার স্ত্রী দুজনেই খারাপ ছিলো তাই এটা স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সফল বৈবাহিক জুটি ছিলো না। তাই আবু লাহাবের স্ত্রী  ‘ঝাওজ’ ছিলো না বরং ‘ইমরআ’ ছিলো।     

তবে হযরত যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীর ক্ষেত্রে ২ টিই ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯ তম সূরা মারইয়াম এ যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ইমরআ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি ছিলেন বন্ধ্যা (সন্তানহীন)।    

এরপর ২১ তম সূরা আল আম্বিয়ার ৯০ নং আয়াতে বর্নিত আছে যে, তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। তখন যাকারিয়া (আ) এর স্ত্রীকে ‘ঝাওজ’ বলা হয়। কারন তখন তিনি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের সাফল বৈবাহিক জুটি ও সন্তান  এই দুটি বৈশিষ্ট্যেরই অধিকারী হন। কি অসাধারন আল্লাহর শব্দচয়ন!!!   

দুনিয়ার জীবনে স্বাভাবিকভাবে পরিবারের সদস্যরা কোন উপলক্ষে, বিপদ বা অসুস্থতায় বা মারা গেলে দূর দুরান্ত থেকে একত্রিত হয়, পেরেশান থাকে সেই সদস্যকে নিয়ে । কিন্তু পরকালিন জীবনে পুরাই উল্টা হয়ে যাবে। ৩৪-৩৭ আয়াতে জানা যায় যে, পরিবারের সদস্যরা (ভাই, মা, বাবা, স্পাউস, সন্তান) একে অপর থেকে দূরে পালিয়ে যাবে এবং নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। কত ভয়াবহ সেই দিন চিন্তা করা যায়।

সূরা আবাসার ৩৬ নং আয়াতে বোঝানো হয়েছেঃ স্বামী-স্ত্রী উভয়ের বৈবাহিক জুটি সফল হোক বা না হোক, সন্তান থাকুক বা না থাকুক পরকালে কিয়ামতের সময় তারা একে অপর থেকে দূরে সরে যাবে। স্বামী-স্ত্রীর এই বিশেষ সম্পর্ককে বলা হচ্ছে সহিবাহ (সঙ্গী)। এই সময়ে মানুষ অন্য সকল সম্পর্কের মানুষকে ভুলে শুধুমাত্র নিজের চিন্তায় মগ্ন থাকবে। 

অর্থাৎ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন শব্দের ব্যবহারের মাধ্যমে কোন বিষয় উপস্থাপন ও পর্যালোচনার এই সুন্দর পদ্ধতি কুরআন আমাদের শেখায়।  

এর মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ অবশ্যই 'ঝাওজ'। এজন্য আল্লাহ আমাদের দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন সূরা ২৫ নং আল ফুরকন এর ৭৪ নং আয়াতে। হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এমন 'ঝাওজ' (জীবনসঙ্গী) ও সন্তানাদি দান কর যারা আমাদের চোখ জুড়িয়ে দেয় আর আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দাও।

মানুষের সৃষ্টির সূচনা আল্লাহ নিখুঁতভাবে বর্ননা করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনিই তো জানেন কিভাবে এই সৃষ্টি হয়েছে। তাই তিনি মানুশকে তার সৃষ্টি সম্পর্কে অন্ধকারে রাখেননি, বিভিন্ন আয়াতে বলে দিয়েছেন। এক্ষেত্রে তিনি ‘নুতফাহ’(নগণ্য পরিমান তরল/শুক্রাণু) শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এটি পাওয়া যায় আল কুরআনের ১৬:৪, ১৮:৩৭, ২২:৫, ২৩:১৩, ৩৫:১১, ৩৬:৭৭, ৪০:৬৭, ৫৩:৪৬, ৭৫:৩৭, ৮০:১৯ তে।  

পরের সূরার সাথে সম্পর্কঃ  ৮০ নং সূরা আবাসাতে আল কুরআন হতে দূরে সরে যাওয়া (আয়াত ১৭) এর বিষয়টি উঠে এসেছে। আল কুরআন সম্পর্কে গাফেল থেকে তা থেকে দূরে থাকার ফলে যার মাধ্যমে এই কুরআন মানুষের কাছে এসেছে সেই মহান মানব থেকেও মানুষ দূরে সরে গিয়েছে; যার বর্ননা এসেছে ৮১ নং সূরা  আত তাকবীর এ (আয়াত ২৬)। আর আল কুরআন থেকে দূরে থাকার ফলে মুহাম্মাদ (স) থেকে দূরে থাকা হয়েছে যার চুড়ান্ত পরিনতি হিসাবে আল্লাহ থেকে দূরে থাকা হয়ে গেছে। এই সূরায় (৮২ নং সূরা আল ইনফিতার) সেটিই প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে (আয়াত ৬ এ)।        

  


উপরের নোটের কিছু অংশ উস্তাদ নোমান আলী খান এর বিভিন্ন লেকচার এবং ইন্টারনেট থেকে কিছু ভিডিও, ছবি থেকে অনুপ্রানীত হয়ে সম্পাদনা করে গ্রহণ করা হয়েছে। কুরআন সম্পর্কে 
উস্তাদের দারুন বই কিনতে পারেন এই লিঙ্ক থেকেঃ রিভাইভ ইয়োর হার্ট ডিভাইন স্পিচ

মন্তব্যসমূহ